শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৭ পূর্বাহ্ন

মো: একরামুলহক মুন্সী:
সময়টা ১৯৯৬ সাল। আধুনিকতার ছোঁয়া তখনো মফস্বলের সংবাদজগতে লাগেনি। সেই সময়ে খুলনা থেকে প্রকাশিত ও অধ্যক্ষ আলী আহমেদ সম্পাদিত ‘দৈনিক অনির্বাণ’ পত্রিকায় চিতলমারী উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে শুরু হয়েছিল আমার সাংবাদিকতার রোমাঞ্চকর যাত্রা। পেছনের দিকে তাকালে আজো মনে হয়, সে এক অন্যরকম লড়াই আর আবেগের দিন ছিল।
তখনকার দিনে আজকের মতো ল্যাপটপ, স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটের ছড়াছড়ি ছিল না। সাদা কাগজে কলম দিয়ে খসখস করে সংবাদ লিখে ছুটতে হতো দূরবর্তী টেলিফোন এক্সচেঞ্জে। সেখান থেকে মুখে বলে বলে পত্রিকা অফিসে খবর পাঠানো হতো। কিন্তু সেই যান্ত্রিক যোগাযোগও সবসময় ঠিকঠাক কাজ করত না। ফলে নির্ভরযোগ্য উপায়ের খোঁজে বেছে নিতে হতো কঠোর পরিশ্রমের পথ।
সারাদিন ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সংগ্রহ করতাম। তারপর গভীর রাতে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যেত, তখন শুরু হতো মূল লড়াই। টেবিলে বসে লিখতে লিখতে যখন শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে পড়তে চাইত, তখনো থামার উপায় ছিল না। বিছানায় বুকের নিচে বালিশ চাপা দিয়ে, ডান হাতে কলম উঁচিয়ে সাদা কাগজের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখে যেতাম। একে একে ৫ থেকে ৭টি সংবাদ লিখতে লিখতে ঘড়ির কাঁটা পেরিয়ে গভীর রাত হয়ে যেত।
সবচেয়ে মজার এবং কষ্টের ব্যাপার ছিল, তখন আমাদের গ্রামে কোনো বিদ্যুৎ ছিল না। কুপবাতি বা কেরোসিনের প্রদীপের আবছা আলোয় চলত আমার এই লেখার যুদ্ধ। প্রদীপের একটি চিরন্তন ধর্ম হয়তো অনেকেরই জানা আছে—নিচু হয়ে কাজ করলে তার চিমনীহীন কালো ধোঁয়া আর কালি নাকে-মুখে এসে লাগে। আর বালিশে বুক ঠেকিয়ে যখন প্রদীপের সামনে একমনে সংবাদ লিখতাম, তখন সেই কালির হাত থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো উপায় ছিল না। লেখা শেষ করে ক্লান্ত শরীরে কখন যে ঘুমিয়ে পড়তাম, তা নিজেও জানতাম না।
ভোরের আলো ফুটলে যখন ঘুম ভাঙত, তখন এক অদ্ভুত মিষ্টি দৃশ্য অপেক্ষা করত। আমার স্ত্রী ঝর্ণা এসে আমার সামনে আগের যুগের সেই চেনা আয়নাখানা ধরে মৃদু হেসে বলতেন, “একটু আয়নায় নিজের মুখখানা দেখ।”
আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের রূপ দেখে নিজেই চমকে উঠতাম! সারা মুখের চামড়া কেরোসিনের কালিতে কয়লার মতো কালো হয়ে থাকত। নিজেকে চেনার উপায় থাকত না। তখন ঝর্ণাকে বলতাম, “তাড়াতাড়ি সাবান আর গামছা দাও, গোসল সেরে এখনই খুলনা ছুটতে হবে।”
ঝটপট গোসল সেরে, মুখে দুটো গুজে নিয়ে তৈরি হয়ে নিতাম। তারপর একটি ঝোলা ব্যাগে সারারাত ধরে পরম মমতায় লেখা খবরের কাগজের বান্ডিলটি ভরে রওনা হতাম খুলনার উদ্দেশ্যে।
আজকের ডিজিটাল যুগে বসে সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে চোখে জল আসে, আবার বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। সেই কালিমাখা মুখ আর কুপবাতির আলোই ছিল আমার সাংবাদিকতা জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়।
তখনকার জনপদ ছিল অনুন্নত, রাস্তাঘাটের অবস্থা ছিল অত্যন্ত বেহাল। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি সেই চেনা গাঁয়ে। আমার বর্তমান উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের পথ বাখরগঞ্জ বাজার। পায়ে হেঁটে কাদা-মাটি মাড়িয়ে পৌঁছাতে হতো সেই বাজারে। সেখান থেকে যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ছিল ভাড়াটে নৌকা। চার-পাঁচজন আরোহী নিয়ে মাঝি যখন বৈঠা বাইতেন, তখন চিত্রা নদীর বুক চিরে রূপালী জল কেটে নৌকা এগিয়ে চলত। প্রায় দশ কিলোমিটারের সেই দীর্ঘ জলপথ পাড়ি দিয়ে আমরা পৌঁছাতাম যাত্রাপুর বাজারে।
যাত্রাপুরে পৌঁছেই চলত দুপুরের আহার পর্ব। রুটি আর আখের গুড়ের সেই সাদামাটা মধ্যাহ্নভোজের স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে। ক্ষুধা নিবারণ করেই আবার পায়ে হেঁটে রওনা হতাম যাত্রাপুর রেললাইনের পানে। বাগেরহাট থেকে রূপসা ঘাট পর্যন্ত চলত কয়লাচালিত ধোঁয়া ওড়ানো রেলগাড়ি। (যদিও কালের বিবর্তনে সেই ঐতিহ্যবাহী রেল চলাচল আজ বন্ধ হয়ে গেছে)। কয়লার গন্ধ আর ট্রেনের ঝকঝক শব্দ গায়ে মেখে বিকেল আনুমানিক পাঁচটা নাগাদ পৌঁছাতাম রূপসা ঘাটে। সেখান থেকে খেয়া পার হয়ে সরাসরি চলে যেতাম কাঙ্ক্ষিত পত্রিকা অফিসে।
পত্রিকার বার্তা সম্পাদক পরম শ্রদ্ধেয় হায়দার ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করতেই বুকটা দুরুদুরু কাঁপত। তাঁর হাত দুটো জড়িয়ে ধরে পরম শ্রদ্ধায় তুলে দিতাম ধবধবে সাদা কাগজের ওপর আমার নিজের হাতে লেখা সংবাদের খসড়াটি। তিনি অত্যন্ত যত্নসহকারে সেটি সম্পাদনা (এডিট) করে দিতেন কম্পোজম্যানের হাতে। যতক্ষণ না সেই সংবাদের প্রতিটি অক্ষর কম্পিউটারে টাইপ বা কম্পোজ হতো, ততক্ষণ চোখের পাতা এক করতে পারতাম না; জেগে থাকতাম চাতক পাখির মতো। গভীর রাতে যখন খবরটি চূড়ান্ত ছাপার জন্য প্রেসে চলে যেত, তখন ক্লান্তিচ্ছন্ন শরীরে পত্রিকা অফিসের মেঝেতেই বিছিয়ে দিতাম নিজের ক্লান্ত দেহ। মেঝেতেই পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়তাম।
ভোর হতেই যখন চারপাশ কাঁপিয়ে প্রেসের চাকা ঘোরার শব্দ আসত, ধড়ফড় করে জেগে উঠতাম। বুকভরা উত্তেজনা নিয়ে সদ্য ছাপা হওয়া সুবাসিত কাগজের ঘ্রাণ নিতাম। অধীর আগ্রহে দ্রুত চোখ বুলাতাম—আমার পাঠানো সংবাদটি আজ কোন পাতায়, কতটুকু জায়গা জুড়ে স্থান পেয়েছে!
সেই কাকডাকা ভোরেই আবার বান্ডিল ভরা পত্রিকা বগলে নিয়ে ছুটে চলতাম চিলতমারীর উদ্দেশ্যে। কারণ, উপজেলার প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে সূর্য ওঠার আগেই যে পত্রিকা পৌঁছে দিতে হতো! আমার এই অবিরাম ছুটে চলা আর খবরের পিছনের মানুষটিকে দেখে সমাজ তখন দুভাগে বিভক্ত ছিল। পত্রিকা পড়ে কেউ সম্মানের সাথে বলত ‘সাংবাদিক’, আবার কেউ বা টিপ্পনী কেটে বলত ‘সাংঘাতিক’।
সময়ের চাকা ঘুরেছে। আজ আমি নিজেই একটি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক। পাশাপাশি দেশের প্রথম সারির একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি। আজ পেছনের সেই ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে তাকালে চোখ ভিজে ওঠে অশ্রুতে, আর মন ভরে ওঠে তৃপ্তিতে। বুক ফুলিয়ে আজ বলতে পারি—সততা, নিষ্ঠা আর ত্যাগের কষ্ট কখনো বৃথা যায় না।