শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৭ পূর্বাহ্ন

একরামুল হক মুন্সী:
স্বজন হারানোর বেদনা থেকেই জন্ম নিয়েছে জীবন বাঁচানোর প্রযুক্তি। বাগেরহাটের তরুণ ধিলন রায়ের উদ্ভাবিত ‘নিওসেভার’ মাত্র তিন ক্লিকেই অ্যাম্বুলেন্স সেবা পৌঁছে দিতে কাজ করছে। ডিইআইইডি (DEIED) প্রকল্পের জাতীয় উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতায় সেরা তিনে স্থান পাওয়া এই উদ্যোগ এখন দেশের স্বাস্থ্যসেবায় নতুন আশার নাম।
ধিলন রায় বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার চরবানিয়ারী দক্ষিণপাড়া গ্রামের সন্তান। জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে স্বজন হারানোর বেদনাই তাকে নতুন সমাধানের পথ দেখিয়েছে। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি তৈরি করেছেন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘নিওসেভার’ (NEOSAVER)। যার মাধ্যমে মাত্র তিনটি ক্লিকেই জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবা পাওয়া সম্ভব। খুলনা নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির সিএসই (CSE) বিভাগের এই শিক্ষার্থী নিজের উদ্যোগে কাজটি শুরু করেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তরুণদের অংশগ্রহণে এটি একটি কার্যকর নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে আইসিটি বিভাগের আয়োজিত ‘তারুণ্য, স্টার্টআপ ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের DEIED প্রকল্পের আওতায় ‘ইউআইএইচপি’ (UIHP) নামের এই প্রতিযোগিতায় দেশসেরা ৩০০টি উদ্ভাবনের মধ্যে ‘নিওসেভার’ অন্যতম সেরা তিনটি স্টার্টআপের একটি হিসেবে নির্বাচিত হয়। স্বাস্থ্যপ্রযুক্তিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রকল্পটি এক লাখ টাকার সিড ফান্ড (Seed Fund) অর্জন করেছে। গ্রামের সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা ধিলন রায় প্রমাণ করেছেন—সুযোগ পেলে মেধা শুধু শহরে নয়, দেশের প্রত্যন্ত জনপদেও বিকশিত হতে পারে। মানুষের জীবন রক্ষার লক্ষ্যেই তার এই উদ্ভাবন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
ধিলনের এই সাফল্যে আনন্দিত তার এলাকাবাসী ও শিক্ষকেরা। চিতলমারী উপজেলার চরবানীয়ারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অঞ্জন কুমার বাড়ৈ বলেন, “আমাদের বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ধিলন এমন একটি অ্যাপ তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে জরুরি মুহূর্তে খুব সহজেই অ্যাম্বুলেন্স সেবা পাওয়া সম্ভব। তার এই উদ্ভাবন আমাদের সবার জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। আমরা তার এই অসাধারণ উদ্যোগকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই এবং তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও সাফল্য কামনা করি।”
অনলাইন প্রযুক্তির যুগে জরুরি স্বাস্থ্যসেবাকে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সহজলভ্য করতে একটি যুগান্তকারী অ্যাপ ‘নিওসেভার’ উদ্ভাবন করেছেন স্থানীয় তরুণ ধিলন রায়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনোভেশন হাবের সহযোগিতায় তৈরি এই অ্যাপটি দেশের স্বাস্থ্য খাতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিশিষ্টজনেরা।
জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় নতুন দিগন্ত: দেবকী মল্লিক
চিতলমারীর ‘অন্তরালে’ পত্রিকার সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক দেবকী মল্লিক বলেন, “অনলাইন প্রযুক্তির এই যুগে ধিলনের উদ্ভাবিত অ্যাপটি একটি যুগান্তকারী ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমাদের এলাকার একজন সন্তান এমন মানবকল্যাণমূলক ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা অত্যন্ত গর্বের বিষয়।”
উদ্যোগটি তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান: ধনঞ্জয় রায়
ধিলন রায়ের পিতা ধনঞ্জয় রায় বলেন, “আমার ছেলের তৈরি এই অ্যাপটি দেশের তৃণমূল ও প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে যাক, এটাই আমার একান্ত চাওয়া। এর মাধ্যমে দেশের প্রতিটি মানুষ যেন জরুরি মুহূর্তে সহজে অ্যাম্বুলেন্স সেবা পায়। এই জনকল্যাণমূলক উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে আমি বাংলাদেশ সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি। যথাযথ সহায়তা পেলে অ্যাপটি দেশের স্বাস্থ্যসেবায় অনন্য অবদান রাখবে।”
বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে ‘নিওসেভার’ এর জন্ম: ধিলন রায়
অ্যাপটির স্বপ্নদ্রষ্টা ধিলন রায় বলেন, “জরুরি সময়ে অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ার ব্যক্তিগত ও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই আমি এই উদ্যোগ গ্রহণ করি। পরবর্তীতে নিজস্ব প্রচেষ্টায় ‘নিওসেভার’ অ্যাপটি তৈরি করি। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি ইনোভেশন হাবের সহায়তায় প্রকল্পটি আরও গতিশীল হয়েছে এবং বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থী, তরুণ পেশাজীবী ও স্বাস্থ্যকর্মীরা এর সাথে যুক্ত হয়েছেন। এই মহতী কাজের জন্য দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া গেছে।”