বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৩ পূর্বাহ্ন

“মো: একরামুল হক মুন্সী”
“মুন্সী” মূলত ব্রিটিশ ভারত ও মুঘল আমলে শিক্ষিত, দক্ষ লেখক, ফারসি ভাষা বা প্রশাসনিক শিক্ষকদের সম্মানিত উপাধি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। চিতলমারী অঞ্চলে এই বংশের পূর্বপুরুষেরা দ্বীনি শিক্ষা, সমাজ সংস্কার এবং ফারসি-আরবি ভাষায় অগাধ পাণ্ডিত্যের কারণে “মুন্সী” উপাধিতে ভূষিত হন। এই বংশের মানুষেরা শুধু ধর্মীয় ক্ষেত্রেই নয়, তৎকালীন শাসনব্যবস্থা ও স্থানীয় বিচার-সালিশের অত্যন্ত প্রভাব ও সম্মানের অধিকারী ছিলেন।
চিতলমারীর মুন্সী বংশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গৌরবময় চরিত্রে ছিলেন আলহাজ্ব হযরত মাওলানা হাছেন উদ্দীন মৌলভী (র.) তার অপর জমজ ভাইয়ের নাম ছিলো হোসেন উদ্দীন মুন্সী। একজন মুন্সী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন অপরজন মৌলভী।
তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার এক ক্ষণজন্মা আলেম ও আধ্যাত্মিক সাধক আলহাজ্ব হযরত মাওলানা হাছেন উদ্দীন মৌলভী (র.) ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৪-১৯১৮) ইরাকের বসরা অঞ্চলে যখন যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে, তখন ইসলাম ও খেলাফতের পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশ্যে তৎকালীন ভারতবর্ষ থেকে যে কতিপয় বীর মুসলিম ও আলেম সশরীরে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে মাওলানা হাছেন উদ্দীন মৌলভী অন্যতম। তিনি ব্রিটিশ ভারতের সেনা বা স্বেছাসেবী দলের অংশ হিসেবে সুদূর ইরাকের বসরা সীমান্তে গমন করেন।
বসরার সেই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তিনি অক্ষত ও বিজয়ী বেশে স্বদেশে ফিরে আসেন। ফিরে আসার পর তাঁর নামের সাথে “বসরি” বা বীরত্বের বিশেষ খেতাব যুক্ত হয় এবং তিনি এলাকায় ধর্মীয় পুনর্জাগরণের নের্তৃত্বদেন। তাঁর এই ঐতিহাসিক অবদান চিতলমারী ও তৎকালীন বাগেরহাট অঞ্চলের মুসলমানদের আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
হাছেন উদ্দীন মুন্সী বসরা থেকে ফেরার পর সম্পূর্ণভাবে দ্বীনি শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারে কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি ছিলেন একজন সুঠাম ও গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। তাঁর মুখে ছিল সুবিন্যস্ত সাদা-কালো (পাকা) দাড়ি। চোখে একাধারে আধ্যাত্মিক সাধকের গভীরতা এবং বসরার যুদ্ধক্ষেত্রের বীরত্বের তেজস্বী ছাপ। মাথায় জড়ানো ঐতিহ্যবাহী সুতি পাগড়ি (যা সে আমলের আলেমদের আভিজাত্যের প্রতীক ছিল),
মুন্সী বংশের বর্তমান প্রজন্ম শুধু ধর্মীয় শিক্ষাই নয়, আধুনিক উচ্চশিক্ষায়ও দীক্ষিত। এই বংশ থেকে বহু সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, শিক্ষক, এবং সমাজসেবক বের হয়ে এসেছেন। যারা চিতলমারীর সামগ্রিক শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছেন।
চিতলমারী সদর ইউনিয়নসহ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে বর্তমানে মুন্সী বংশের বংশধরেরা অত্যন্ত সুনামের সাথে বসবাস করছেন। কালের বিবর্তনে এই পরিবারের লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে এখন তা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। চিলতমারীর প্রধান জনবসতি ও সমাজ পরিচালনায় তাঁদের পরিবারের বর্তমান সদস্যরাও বেশ জোরালো ভূমিকা রাখছেন।
চিতলমারী উপজেলার মোট জনসংখ্যা যেখানে প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজারেরও বেশি, সেখানে একটি একক প্রাচীন বংশ হিসেবে মুন্সী বংশের জনসংখ্যা ও তাঁদের প্রভাব এলাকাভিত্তিক অত্যন্ত সুসংহত।
মাওলানা হাছেন উদ্দীন মুন্সীর বসরার যুদ্ধক্ষেত্রের বীরত্ব এবং পরবর্তীতে তাঁর বংশের মাধ্যমে শিক্ষার আলো ছড়ানোর গল্প আজও চিতলমারীর মানুষের মুখে মুখে ঐতিহ্য হিসেবে বেঁচে রয়েছে।