শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৭ পূর্বাহ্ন

সম্পাদকের লেখনী থেকে:
একজন সাংবাদিক, লেখক এবং সর্বোপরি সমাজ সংস্কারক হিসেবে পথ চলতে গিয়ে তার যে কিছুটা ভুলত্রুটি থাকবে না—এমনটি নয়। দোষে-গুণেই তো মানুষ। সমাজের বুকে জেঁকে বসা অন্যায় আর কলঙ্ক মুছে দিতে অনেকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী লেখনী ধারণ করতে হয়েছে। আর এই কণ্টকাকীর্ণ পথে চলতে গিয়ে কিছু মানুষ যে সমালোচনা করবেন, এটাই স্বাভাবিক। তবে বিশ্বাস করি ও আশা রাখি, মৃত্যুর পর এই সমাজের বেশির ভাগ মানুষ যেন এই লেখকের ভেতরের সততা আর লড়াইটুকুকে স্মরণ করেন। জীবনাবসনে যারা এই অধমের কর্মখণ্ডকে মনেপ্রাণে এবং লেখনীর মধ্য দিয়ে উজ্জীবিত করে রাখবেন, তিনি বা তারাই হবেন আমার প্রকৃত আপনজন। তিনি হতে পারেন আমার সহধর্মিণী, আমার ছেলে, মেয়ে, পুত্রবধূ, ভাইবোন কিংবা আমার পরম শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক বন্ধু-বান্ধব।
জীবনের তাগিদে মনের অজান্তেও যদি কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকি, তবে সবার প্রতি আমাকে ক্ষমার প্রত্যাশা রাখবো। কারণ, এই নশ্বর পৃথিবীতে শত চেষ্টা করলেও সব মানুষের মন রক্ষা করে চলা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।
পারিবারিক জীবনে আমি আমার পরম মমতাময়ী মা আর শ্রদ্ধেয় পিতাকে হারিয়েছি অনেক ছোটবেলায়। বাবা-মার চার সন্তানের মধ্যে আমি কনিষ্ঠ পুত্র। আমার ছোট বোন রেহানা পারভিন, যিনি একজন সাধারণ গৃহিণী এবং একজন গর্বিত পুলিশ সদস্যের সহধর্মিণী। আমাদের অন্য ভাইদের মধ্যে বড় ভাই মো: সিরাজুল হক মুন্সী, মেজো ভাই নূরুল হক মুন্সী এবং সেজো ভাই গাউছুল হক মুন্সী (যিনি তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস বা বিডিআর-এর অবসরপ্রাপ্ত হাবিলদার ছিলেন)—তাঁরা তিনজনেই আজ পরলোকে পাড়ি জমিয়েছেন।
তিন ভাইয়ের অকাল প্রয়াণের পর আজ শুধু আমি আর আমার ছোট বোনটিকে মহান আল্লাহপাক এই পৃথিবীতে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছেন।স্মৃতির পাতা ওল্টালে শৈশবকালের দিনগুলো আজও মনের মণিকোঠায় ভেসে ওঠে। আমি তখন বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলার নিভৃত পল্লী আড়ুয়াবর্ণী চর পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক চঞ্চল শিক্ষার্থী। আমার অক্ষরের দুনিয়ায় পা রাখার আগেই পিতা আমাদের ছেড়ে চলে যান। চরম অভাবের সংসার ছিল আমাদের। নুন আনতে পান্তা ফুরনোর সেই দিনগুলোতে আমাদের ঘরে একটা জীর্ণ কাঠের বাক্স ছিল, যা মা খুব যত্ন করে আগলে রাখতেন।
সেই বাক্সের ভেতরে লুকানো ছিল একটি তামার বাটি। ওই বাটিতে মা পরম মমতায় সংসারের খরচ বাঁচিয়ে দু-চারটি খুচরা পয়সা গচ্ছিত রাখতেন। প্রতিদিন যখন আমি স্কুলে রওনা হতাম, মা সেই তামার বাটি থেকে চার আনা কিংবা ছয় আনা বের করে আমার ছোট্ট হাতের মুঠোয় গুঁজে দিতেন। স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের সাথে টিফিনের সময় তা দিয়ে চকলেট, চানাচুর কিংবা বিস্কুট কিনে খেতাম। সেই সামান্য চার-ছয় আনার আনন্দ আজ কোটি টাকার চেয়েও দামি মনে হয়। প্রচন্ড অভাবের সেই দিনগুলোয় আমাদের বড় দুই ভাই-ই ছিলেন সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম চালিকাশক্তি।
প্রাইমারির গণ্ডি পেরিয়ে আমি যখন চিতলমারী এস.এম. মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, ঠিক তখনই আমাদের সেজো ভাই বাংলাদেশ রাইফেলসে (বিডিআর) চাকরি পান। পরিবারে যখন মাত্র একটু সচ্ছলতার আলো ফুটতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই আমাদের মাথার ওপর থেকে পরম আশ্রয়ের শেষ ছায়াটি সরিয়ে নিয়ে মা-ও ইন্তেকাল করেন। মায়ের সেই চলে যাওয়ার পর থেকে শুরু হলো জীবনের অন্য এক কঠিন অধ্যায়। মা-বাবা হীন এক কিশোরের বুকভাঙা কষ্ট, সীমাহীন একাকীত্ব আর শত চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজকের এই ‘সাংবাদিক একরামুল হক মুন্সী’ হয়ে ওঠার পেছনে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ ইতিহাস, যা অসংখ্য কষ্টের স্মৃতিগাঁথা আর জীবনের অনন্য লড়াইয়ে মোড়ানো এক টুকরো ইতিহাস। সকলে আমার মমতাময়ী “মা” বাবা ও ভাই দের আত্মার মাগফিরাত কামনা করবেন।
মো. একরামুল হক মুন্সী, লেখক-সাংবাদিক ও সম্পাদক: পাক্ষিক“চিতলমারীর অন্তরালে”।